Friday, June 26, 2026

বাক্সবন্দি স্বপ্ন

জীবনের থেকে দীর্ঘ রাস্তাগুলো, করতে হবে পার

দেহ নিজেকে টানছে, মন চলতে চায় না আর।

বাক্সের মতো চারকোনা ঘরে বহু স্বপ্ন বাস করে,

অপূর্ণ আশার উষ্ণ অশ্রু শুধুই ধোঁয়া হয়ে উড়ে।


জীবনে ভরা অসংখ্য স্বপ্ন, কিছু এমনি রয়ে যাবে

রোজ যুদ্ধে ছোট স্বপ্নরা, বড় স্বপ্নের ফাঁকে হারাবে।

ছুটছে জীবন, ছুটছে মানুষ, স্বপ্ন দেয় না ধরা,

উধাও অশ্রু, পড়েছে ভাটা, চারিধারে শুধু খরা।


নামছে দেখ দিনের শেষে, ওই মেঘ আকাশ থেকে

বুকের আশা হল না শিক্ত, জীবন চলে এঁকেবেঁকে।

তাগিদের কারাগারে অনেক স্বপ্ন, নিজেই বন্দি হয়

তালাবন্ধ ভেতরে, ধীরে ধীরে চলে স্বপ্নের অবক্ষয়।


তবুও চলছে জীবন, জানি তা আগামীতেও চলবে

কম্পিত শিক্ষা নেভার পূর্বে, তারই ন্যায় জ্বলবে।

কিছু নিজ স্বপ্নের আহূতিতে, নতুন স্বপ্ন জন্ম নেবে

এই জীবন ধারা এমনি করেই ভবসাগরমুখী হবে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


চেনা অচেনা

চেনা জঙ্গলে প্রতিবার দেখি অচেনা কত পাতা।

নতুন করে হয় চেনা, নতুন করে হয় পরিচয়, যেন

তখনই, সেই মুহূর্তে ওটাই প্রথম জঙ্গল দেখা।


বাড়ির মাধবীলতা আজ অনেকটা বছর রয়েছে,

করে নিয়েছে নিজের জায়গা। ছোটবেলা থেকেই 

সে বড় হচ্ছে আমারি সাথে। তবে সে অনেকটা

ধৈর্যশীল নিজের বাহুডোর বিস্তারের ক্ষেত্রে। ফুল

ফোটার থেকে তার রঙের পরিধানে যেই পরিবর্তন

আসে সেটা লক্ষণীয়।


সাদা থেকে হালকা গোলাপি এবং পরিশেষে সে

ধারণ করে তার চিরস্থায়ী লালিমার রূপ। ফুল

বদলায় নিজের রং, বদলায় নিজেকে রোজকার 

দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। রৌদ্রে সাদা ফুলের রূপালী শান্ত

রূপ মেঘলা আকাশের সময়ে নিজেকে মেলে ধরে

এক অনন্য রূপে।


একে অপরের বিপরীতে সাজানো শ্যামল পত্রকের

ক্ষমতা আছে ফুলের সাঁজের সাথে পা মিলিয়ে

চলার। বৃদ্ধ পাতার কালচক্রে পিঙ্গলরুপ নিজেকে

নিঃশেষ করে ঝরে পড়ার আগে, রংবাহারি ফুলের

মাঝে সে এনে দেয় এক মিষ্টি মাধুর্য।

হলো না হয় সে ক্ষণিকের!

এমনি চেনা জঙ্গলে রয় কত অচেনা মাধবীলতার

ন্যায় অচেনা ফুল। ওরাও অপেক্ষায় থাকে আমারই 

মতন পথিকের আকুল দৃষ্টির তৃষ্ণায়।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

সে যে বাঁধনছাড়া

বর্ষালো না যেই মেঘ সেও লুকোচুরি খেলে

জন্ম আকাশের যেখানে তারেই গেল ফেলে।

খুঁজেছিল কিছু অদৃশ্য ভবঘুরে কুয়াশার দল

দেখেছে আকাশ থেকে ঝর্ণা আর রূপালী জল।


ঘরছাড়া হলো যেই মেঘ অন্য মেঘের খোঁজে 

কে রেখেছে তারে মনে, নীল আকাশের মাঝে।

যেমন চায় উড়ে বেড়ায়, পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে যায়

সরল, স্বচ্ছ কিছু আনন্দ, সে সবার মাঝে বিলায়।


মন যে তার বাঁধনছাড়া, দুনিয়া তার সবুজ নীলে,

যৌবনের টানে কখনো, সে নামে সোনালী ঝিলে।

কুয়াশার সাথে এক হয়ে, বদলে ফেলে তার রূপ,

নীরবতা তার পুরোনো বন্ধু, সে একাকী থাকে চুপ।


উত্তর থেকে উড়ে, দেখে ওই দক্ষিণের মেঘ চঞ্চল,

শ্যামল ভূমি যতই দূরে, ততই ক্ষীণ তার কোলাহল।

গাঙচিল তার পাখনা মেলে, মেঘকে ছুঁয়ে চলে,

যা শোনেনি ঝরা মেঘ, সে শুধুই এই মেঘকে বলে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


চুপ থেকেও বলা

দুই দশকেরও বেশি হল, আমাদের দেখা হয়েছিল,

প্রথম পরিচয় থেকে আজ অবধি সীমিত কথা ছিল

তবে ভাবের প্রকাশে ছিল প্রাচুর্যতা। ভাব প্রকাশের

ক্ষেত্রে শব্দের কখনোই টান পড়েনি আঁখির ভাষায়

বরং চুপ থেকেও একে অপরকে করা হয়েছে

তারামণ্ডলীর সমষ্টির ন্যায় অসীম ভাবের বিবরণ।

অনেকটা সময় পার করতে করতে এটা মনে হয়,

হয়তো প্রতি মুহূর্তে কিছু বলা থেকে গিয়েছিল

বাকি। মনে পড়ে বহু কথা মনের মাঝে হারিয়েছিল,

অন্য জরুরি কথা বলার জন্যে।


এটাও মনে পড়ে যে জরুরি কথাগুলো কোনো

কারণে বলা হয়নি। হয়তো তোমার সাথে আমার

সময় মেলেনি, কথা নুরি পাথরের মতো বড় শিলার

ফাঁকফোকরে মাঝে গিয়েছিল হারিয়ে। চোখের

ভাষায় হারিয়েছিল কথা। বয়সের রেলগাড়ি ছুটে

চলছে আপন গতিতে, কিন্তু কেন জানি না, কিছুটা

করে জীবনের অধ্যায় মনে হয় হিসেবের খাতায়

নেই যেমন গভীর রাতের ট্রেন সফরে পার করা

স্টেশনের কোনো হদিস নেই।


বয়সের কুঁচকে যাওয়া চর্মের ওপর সময়ের প্রলেপ 

আজও তোমাকে ছুঁতে পারেনি, তোমার হাসিটি

আজও রয়েছে শিশুসুলভ অমলিন। নদীর ওপরের

স্তর যত হয় শান্ত ততটাই সে হয় গভীর। তোমার

আঁখির কথপোকথনের কৌশল যেন এক প্রাচীন

লুপ্ত ভাষার ব্যাকরণের ভাস্কর্য। আমি আজো চলার

পথে সেই চোখের চাউনির আলোর পথ ধরে

পুরনো অন্ধকারে পার করা স্টেশনের নাম মনে

করার চেষ্টা করি।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


Monday, June 22, 2026

একটু মন খুশি

ছোটবেলার ইচ্ছের দেওয়ালে হেলান দিয়ে যদিও

দাঁড়ানোর সুযোগ নেই তবু ইচ্ছে আছে অপরিসীম।

মনের রঙিন দেওয়াল থেকে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার

পলেস্তারা সময়ের সাথে ঝরে পড়েছে অল্প অল্প

করে। সে অগ্রিম জানান দেয়নি, সে কখনো

ইশারাকরে বলেনি তার বিদায় অনেক আগে

থেকেই শুরু হয়েছিল।


যৌবনের প্রাতঃকালে, যখন রঙিন দেওয়ালের ছিল

প্রয়োজন তখন দেখি ভাগ্যের মুঠো খালি প্রায়। 

একমুঠো বালি চেপে ধরে রেখে যেমন তাকে কণা 

রূপে কালচক্রে হারাতে হয়, ঠিক তেমনি প্রকার

খালি হাত ভরার শুরু হয় যুদ্ধ। সে এক অক্লান্ত

ঘড়ি চলার মতন জীবনের ঘূর্ণি।

সে থামবে একদিন, সে নিশ্চিত থামবে কিন্তু সেই

পুরনো রঙিন দেওয়াল দেখতে আমরা অনেকেই

থাকব না।


তাই যুদ্ধ চলাকালীন, প্রজাপতির উড়ান, নীল

আকাশে ধূসর মেঘের খেলা, পোকামাকড়ের খেলা

শ্যামলের কোলে, বৃষ্টিতে ভেজানো মন এইসবের ও

আনন্দ নিতে থাকা প্রয়োজন। জীবনযুদ্ধ চালাতে

এমন প্রকার ছোট ছোট মন খুশি করার মুহূর্তে

নিজেকে পূর্ণপ্রকার লিপ্ত করতে হয়!

নাহলে কার জন্যে এই যুদ্ধ? কিসের জন্যে যুদ্ধ?



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


দাঁড়িয়ে সময়

স্মৃতির পাতায় সেদিন সময়ও গিয়েছিল থমকে,

ছিল না কোনো দ্বন্দ্ব, বৃষ্টি ভেজা শীতল সন্ধ্যায়।

হাওয়া পেয়েছিল তার নিজ উন্মুক্ত সুখের উড়ান,

সেদিন উত্তরের বাতাস হয়েছিল দক্ষিণমুখী ঝড়।


অলসতা নিয়েছিল ছুটি, বর্ষণের তারুণ্য চঞ্চলতায়,

বহমান সময় কখনও ক্ষণিকের জন্যে স্থিরতার 

দায়িত্ব পালনে অভেদ্য পাথররুপী স্মৃতির শিলায়

নিজেকে লুটিয়ে দিয়ে, মনের দরজায় কড়া নাড়ে।


স্মৃতির ফুলদানিতে আনন্দ উচ্ছাসের বারিধারা

ইচ্ছের পুরোনো পাপড়িগুলোয় করে প্রাণ সঞ্চার।

দেখা যায় অনেকটা ফ্যাকাশে হওয়া, মুর্ঝা যাওয়া

শুষ্ক মনের কোটরে ধরা দেয় এক আর্দ্র অনুভূতি।


উচ্ছল বৃষ্টির কণা, মনের আয়নাতে তৈরি করে না

কোন প্রতিবিম্ব। মনের উচ্ছাসের ছবি ফুটে ওঠে

ধীরে ঝরে পরা জলবিন্দু’র নির্মিত কল্পনার হ্রদে।

নির্বিকার একাগ্র চিত্তের মন, নিজেকে করে বন্ধক

বর্ষার সন্ধ্যায় এক পেয়ালা চা, কলম, কাগজ ও

কাব্যিক চিন্তার উন্নমন স্রোতে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


কালো ধোঁয়া

অনেক বছর কেটেছে, পূর্বের আকাশ হয়নি লাল

শুধু বারুদের গন্ধ, উড়ে চলছে যুদ্ধের নগ্ন পাল।

মাটির অজানা নিজ সীমানা, সরলতার রক্ত ঝরে

মৃত মায়ের বক্ষ আঁকড়ে শিশু কান্নায় ঘুমিয়ে পরে।


জীবন যেখানে সরল ছিল, জানত না কেউ বিদ্বেষ

পুরাতন আগুন নেভেনি আজো, সবই প্রায় শেষ।

শ্যামল খেলার মাঠ, থাকত শীতল রৌদ্র দ্বিপ্রহর    

পরে আছে সেখানে আজ স্তূপাকৃত লাশের কবর।


গোলার অগ্নিতাপে মাটি তপ্ত, মানুষের হদিশ নেই

একে অপরের শত্রু জেনেই যুদ্ধে লিপ্ত হল সেই।

সংসার হারালো সন্তান, অনেক সংসার উধাও হল

ধূর্ত নেতার কপটতা, তাতে কার কি এলো গেলো!


বহু প্রাণ হারাল ঠিকানা, নীল আকাশ আর নেই

শুকনো রক্ত নদী হয়, করুন বৃষ্টি নেমে আসে যেই।

শকুনের ভরা পেট, ওরা আসে না পচা লাশ খেতে

তবুও কিছু পিশাচ নেতা, যুদ্ধের খেলায় মেতে!



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

বিলিয়ে দেব

ইচ্ছে হয় সবটা বিলিয়ে দিয়ে চলে যাই,

অদূরে হবে দীর্ঘ যাত্রা শূন্য হাতে তাই।

অতীতের বোঝা লাঘবে, চলা সহজ হবে

স্মৃতির বোঝা এই কারণে ছেড়ে দেব তবে।


ভ্রমরদের দিয়ে যাব পাখনা মেলার রহস্য,

স্বাধীন হয়ে নীল আকাশে উড়বে ওরা সহস্র।

মৌমাছিদের দেখাব কোথায় মিষ্টি ফুল আছে,

বন্ধু হয়ে চিরদিনই থাকব সদাই ওদের কাছে। 


ক্ষুদ্র তৃণ জানবে আমি ওদের কথাও ভাবি,

কষ্টের তালা খোলা যায় থাকলে সুখের চাবি।

শুধু একমুঠো চাই মেঘ আর স্বচ্ছ রামধনু,

ওরাবো মনের ক্লেশ যেমন উড়ে পরাগরেণু।


ছিন্ন পিঙ্গল পত্রকে নিজের গল্প শোনাব বলে,

একটু সময় ওদেরও দেব তারপর যাব চলে।

ফেলে আসার কষ্টে, আর চাই না ফিরে যেতে

অতীতের সবটাই আমি নিয়েছি মাথা পেতে।


মনের পাষাণ চূর্ণ করে এখন শুধুই এগিয়ে চলা,

ধূলিকণায় পদচিহ্নে হবে সৃষ্টি নতুন গল্প বলা।

সেই নতুন গল্প একদিন, এমনি হারাবে চিরতরে

করব নতুন এক যাত্রা, অনন্ত রাতের হাতটি ধরে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

আসবে বলেও এলো না

জীবনের বহু ধাপে মন রেখেছে নিমন্ত্রণ সুখের

কাছে। সুখ খুবই ব্যাস্ত বুঝি; এতটাই যে কখনও

এসে কড়া নেড়ে থাকলেও অগ্রিম জানান দেয়নি।

আমিও হয়ত বুঝতে পারিনি। 


বন্ধু এসে ফিরে গেছে জানা গেলে তাকে মানিয়ে

বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনা যেতেই পারে, সেটা সম্ভব।

সুখ যে পেছন পা হেঁটে আর ফিরবে না। জীবনের 

‘ওয়ান ওয়ে’ রাস্তা ধরেই সে এগোয়। যদি কারুর

কাছে সে এসে ক্ষণিকের নেয় বিশ্রাম, তাহলে সুখ

তারই অতিথি - হোক না সে ক্ষণিকের, ক্ষতি কি?


মনের জ্বর রয়ে যায় অনেকটা সময়। ধীরে ধীরে

সে করে গ্রাস মনের অন্দরমহলে। মস্তিষ্কের গবাক্ষ

যে আশার আলো কে ডেকে আনতে চায়, তাকেই

ঢেকে দেয় ভাগ্যের যবনিকা। করুন কাকুতি মিনতি

সবই চাপা পরে যায় অসহায়তার পর্দায়। কখনো

এমনও হয় যে চাপা ইচ্ছের ওপর থেকে পর্দা

সরিয়ে একরাশ স্মৃতির ধুলো উড়িয়ে বুঝতে পারি,

সুখ এসেছিল, তার ডাক আমি শুনতে পাইনি।

সে রেখে গেছে তার অমলিন বার্তা।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


আগাছা

ছোট সবুজ পাতার আগাছা, গোকুলে উঠল বেড়ে

খুব অল্প স্বল্প করে, জমি ওরা নিয়েছিল কেড়ে।

ধ্যান হয়নি দেওয়া, ওরা ছড়িয়েছিল অনেকটা দূর,

শক্ত করে নিজের ভিত, বদলেছিল নিজেদের সুর।


নিপাট গেলো বাগান, সাদা শাড়ির কালো ছায়াতে

দীর্ঘকাল সূর্য রইলো ম্লান, প্রচুর ক্ষমতার মায়াতে।

বাগানের বাহারি রঙিন ফুল, অসময়ে গেল মরে,

পাশের জমির আগাছা, মাটি ও হাওয়া নিল কেড়ে।


শুষে নিয়ে নির্যাস, অন্তিম বিন্দু ওরা করেছিল শেষ

আকাঙ্ক্ষার রক্তে, ওরা রাজ্য ভাসিয়ে ছিল বেশ।

তৃণ দমনে রক্তিম, সাদা কাপড় কলঙ্কে ছিল লিপ্ত

সর্বত্র লুণ্ঠন চালিয়ে রাজ্যে, নিজ জীবন ছিল তৃপ্ত।


কিছু গাছের তীব্র লড়াই ছিল, আগাছাদের বিরুদ্ধে

প্রমাণ সেই প্রতিবাদ, সর্বদা একতরফা হয়না যুদ্ধে।

নির্মূল হলো শেকড়, আগাছা শুকিয়ে হারাল প্রাণ

মাথা তুলে আবার দাঁড়াবে, সেই সুন্দর ফুল বাগান।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


বৃষ্টি

বৃষ্টি বর্ষণে মৃত্তিকার ও মনের হয় পরিবর্তন, দুটোই

পায় শীতলতার এক অনবদ্য আনন্দ। বহুক্ষণের

অপেক্ষা, উপেক্ষা করে নেমে আসে নিজেকে মুক্ত

করে বিলিয়ে দেওয়া অপরূপ কোমল ঝর্ণাধারায়। 

বৃষ্টি যেন মায়ের স্নিগ্ধ কোলের এক অনন্য রূপ।


বৃষ্টিতে সিক্ত হওয়া মন, আছড়ে পরা শৈত্য বাতাস

জানান দেয় জীবনের উত্তপ্ততা যতই কষ্টদায়ক

হোক না কেন, সেটা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণিকের।

অসীম আকাশের বার্তা আনে বৃষ্টি। নিজ উৎপত্তির

ভয়ানক কাহিনী বুকে বেঁধে সে আসে এই সবুজ

ধরণীকে মাতৃ স্নেহের কোমলতায় ঢেকে দিতে।


বজ্রের কম্পন ও ছটা জীবন স্রোতের সূত্রপাত কে

দর্ষায়। সব সৃষ্টির শুরু হয় এক অগ্নিকাণ্ডের হাত

ধরেই যেমন বিজ্ঞানীদের ‘দা বিগ ব্যাং থিয়োরি’।

সব বজ্রের আর্তনাদ এই গোলককে মেঘের অশ্রু

দিয়ে ভিজিয়ে দেয় তা নয়, যেমন জীবনে কান্নায় 

বহুবার মানুষ সোচ্চার হয়েও অশ্রুধারার ঠিকানা 

খুঁজে পেতে রয়ে যায় অক্ষম।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


বৃষ্টি এমনও পারে

বৃষ্টি ভেঙেছে মেঘকে, বৃষ্টি নিজেকে করে চুরমার,

হারিয়ে নিজ পরিচয়, উত্তাল করেছে নদী দুর্বার।

বৃষ্টি ক্ষরণ করে পাহাড়, শিরা উপশিরা দিয়ে বয়, 

রয় না তার প্রাচীন যৌবন, ধীরে ধীরে সে বৃদ্ধ হয়।


বৃষ্টি জুড়েছে মন, না জানি বৃষ্টি ভেঙেছে মন কত,

হয় কাব্যিক, যখন জড়ো হয় জমা অশ্রু রয় যত।

পাহাড়ের চাপা কষ্ট যত, মুক্তি পায় ঝর্ণা হয়ে নেমে,

মনের হয় স্বাধীন বারিধারা, চাইলে যাবে না থেমে।


জীবন দেখে বহু আশার চিহ্ন, আসে না সব কাছে

মরু দেখে বৃষ্টির মেঘ, আসে না এক চিলতে কাছে।

কিছু কষ্ট রেখেছি আমি, শুধু নিকাশি যার বর্ষায়

উষ্ণ অশ্রু মিলেছে শীতল জলে, ঝরেছে নির্দ্বিধায়। 


 

প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


নিয়মের কয়েদখানা

অনেকটা দূরে ইচ্ছে করে বেরিয়ে পরি জীবনের

মানাগুলো মানব না আর। সমাজের নানা রকমের

মানা দেখেছি, সমাজের ‘হ্যাঁ’ আজ অবধি পেলাম

না। জীবনের অনেকটা ‘না’-এর বোঝা এখন

নামিয়ে চলার সময় এসেছে।


সময় আগে থেকেই ছিল নিজেকে স্বাধীন করার।

আমিই নিজেই ছিলাম এই অদৃশ্য মূল্যহীন নিয়মের

যাঁতাকলে বন্দি। সমাজের নিয়ম, সমাজের মানুষ

কে অধীনতার মধ্যে আবদ্ধ রাখলে, সেই নিয়ম তো

বিষবাষ্প ভরা বেলুনের মতো, দেখতে ফলা ফাঁপা 

কিন্তু কোনো কাজের নয়।


সমাজের নিয়ম ভেঙে দিলে যেমন একটা প্রতিবাদী

ফিসফিস সোনা যায়, দেখা যায় ক্রুদ্ধ ভ্রুকুটি, ঠিক

তেমন বিষাক্ত গ্যাস বেলুন থেকে বের করলে

কিছুটা সমাজ বিচলিত হবে ঠিকই, কিন্তু তারপর

স্বচ্ছ বায়ুতে পরবর্তী প্রজন্ম নেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস।


কোনো একটা প্রজন্মকে, এই হাওয়াতে বানানো

জেলখানার তালা ভাঙতে হবে। একজনের জীবনে

করা ত্যাগ পরের প্রজন্মকে একটা সুন্দর স্বাধীন

জীবন দিতে পারে। সমাজের বিদ্রোহের ইতিহাসে

এমন স্তবক বারংবার লেখা হয়েছে আর হবে।


প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

Sunday, June 14, 2026

নির্দিষ্ট

রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা ছোট ছোট পিঙ্গল ফুল

সদাই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকে পা

মাড়িয়ে এগিয়ে চলে আর কেউ বলে জংলি ফুল।

আমি পিঙ্গল সুন্দরী বলেই জানি। 


সারাটা বছর এরা বেড়ে ওঠে বিনা যত্নে আর ফুটে

থাকে ঘন শ্যামলের সম্ভারের মাঝে। পাতা ও ফুল,

দুজনের মাঝে চলে এক মিষ্টি লুকোচুরি খেলা -

পৃথিবীর প্রাণীদের কাছে কে নিজের সৌন্দর্য কতটা

তুলে ধরতে পারে সেটা নিয়ে চলে এক দ্বন্দ্ব। 


এদের প্রতি একাকী দৃষ্টি মনোনিয়োগ করলে 

মানুষ বুঝবে যে কিছু সৌন্দর্য হয় নিশ্চুপ, শান্ত।

নিজেকে সে কারুর কাছে জাহির করার প্রবৃত্তি 

রাখে না। সীমিত কিছু ভাগ্যবান দৃষ্টির জন্যে তার

এই পৃথিবীতে আগমন। সে নিজ সুগন্ধ এমনি 

হাওয়াতে বিকিয়ে দেয় না, সে চায় তাকে ঘ্রাণে 

করা হোক অনুভব নিকটে এসে। 


জীবনে এই ছোট লুকিয়ে থাকা একরাশ পিঙ্গলের

দল শিখিয়ে দেয় যে সব কিছু সবার জন্যে নয়। 

নির্দিষ্ট কিছু সৌন্দর্য, এই পার্থিব জগতে আবির্ভাব

ঘটে এক জোড়া আঁখির জন্যে, সেই মানুষ ও দৃষ্টি 

দুটোই করে সেই পূর্ব নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


পূর্ব পরিচিতি

মনে হয় আগেও চলাচল করেছি এখানে, হয়ত

মানুষ হয়ে আসবার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমি

সঠিক জানি না, তবে এটা মাঝে মধ্যে মনে হয়।

অনেক পুণ্য করলে নাকি মানব জন্ম পাওয়া যায়।

আমার ছোটবেলায়, দিদা’র মুখে শোনা দেব দেবীর

কাহিনীতে এমনটি শুনেছিলাম।


অনেক অপরিচিত রাস্তা দিয়ে প্রথমবার যাত্রা করে

এমনটি বহুবার মনে হয়েছে। কাউকে বলা হয়নি

কারণ এটার কোনো যুক্তি আমার কাছে নেই।

উড়ে চলা পরাগরেণু, ছুঁয়ে যাওয়া বাতাস, মেঘ

বলে যায় কানে কানে পুরাতন পরিচিতির ইতিকথা।

ধূলিকণা মনে করিয়ে দেয় গত জীবনের বন্ধুত্ব।


এই অস্তিত্বের মাঝে বহুবার মন বলেছে প্রথমবার

দেখা মানুষগুলো আগে কখনও কোথাও দেখেছি।

কোথাও একটা পূর্ব জন্মের কাহিনীতে, আমি হয়ত

ছিলাম তাদের জীবনের যাত্রার এক অভিন্ন অঙ্গ।

কিছু মুহূর্তে মস্তিষ্ক জানান দিত এদের আমি খুবই

কাছের মানুষ ছিলাম। হাজারো বার জোর করেও

পাইনি সদুত্তর। মন হয়েছে নিরাশ কিন্তু সেই চিন্তার

ধারা আমায় ছেড়ে যায়নি।


অবশেষে কখনও পরিশ্রান্ত মন পূর্ণ পরিচিতি না 

পেয়ে ভাবে, এরাও কি আমাকে দেখে একই প্রকার 

ভাবনায় লিপ্ত হয়? হয়ত হয় বা হয়না, জানা নেই!



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


দাদু’র বাড়ি

পুরোনো বাড়ির আছে অসংখ্য গল্প, কিছু শোনা -

আর কিছু যার আমি হয়ে রয়েছি অভিন্ন অঙ্গ।

ছোটবেলার সরলতা, অন্যায় আবদার এগুলো -

হারিয়ে যায় সময়ের সাথে, সেটা বাল্যকালে জানা

থাকে না। মন ও দেহ কোনোটাই এই খোয়ানোর

জন্যে কাউকে প্রস্তুত করে না, সম্ভব ও না।


গোলাপ, স্থলপদ্ম, মাধবীলতা - সৌন্দর্য্য ও গঠন

ছাড়াও এদের পরিবেশের মাঝে দেওয়া চঞ্চলতা,

গ্রাম্য বাড়ির প্রতি আমায় চিরকাল করেছে আকৃষ্ট।

গাছগুলোর মধ্যে ছিল প্রাণ, শুধু বিজ্ঞানের দ্বারা

প্রমাণিত বলে নয় - এটা আমার বেড়ে ওঠার

সমকালীন অনুভূতি। মন বুঝতে ও মানুষ চিনতে,

এই বাড়ির ছোট বড় নানান রকম ঘটনা আমার

কাছে রয়ে গেছে শিক্ষণীয়।


জীবনের ত্রিশটা বসন্ত পার করে প্রথম হারানোর 

কালবৈশাখী ছিনিয়ে নিল আমার দাদুকে, আমার

মনের বটবৃক্ষ সেদিন নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল। 

বিশ্বাসের ঝুরিগুলো মাটি আঁকড়েও হয়েছিল চরম

প্রতিবাদী। দাদুর হাতে জন্ম নিয়ে বড় হওয়া

গাছগুলো নিজ প্রাণবন্ত চরিত্র থেকে সরে আসে।

ফুল হারায় রং, মাধুর্য্য ও বেঁচে থাকার প্রবণতা।


পরবর্তীতে, এক দশকের আগেই দিদাও

বিদায় নেন ইহলোক থেকে, বাগান হয় নিঃস্ব।

আজ সেই বাল্যকালের গ্রাম্য বাড়িটির একাকী

বাগানের রুক্ষ প্রান্তর মনে করিয়ে দেয়, ফুল ফল

বা মানুষের বেঁচে থাকতে প্রয়োজন একটা অমর

আত্মিক ভালোবাসার ঝর্ণাধারা।  



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬