Saturday, July 11, 2026

চাবি

ভবঘুরে মেঘ, পাও কি শুনতে আমার ডাক?

রবি’র পূর্বে যেমন কর্কশ কণ্ঠ ছাড়ে কাক।


হারালে কি তুমি, শুনতে পাও আমার দাবি?

জানি ভবঘুরে হওয়ার তোমারই কাছে চাবি।


রাস্তার পেয়েছি বাঁক, রাস্তার দেখেছি শেষ,

এই আকাশ পথ, আছে খোলামেলা বেশ।


নীল আকাশের রাস্তা, শীত চাদর তার মাপ,

মরু আমার চলার পথ, প্রতি পদক্ষেপে তাপ।


তুমি নও গৃহবন্দি, তোমার সাথে হাওয়া চলে,

এই জীবন মুক্ত কয়েদ, বাঁধা এর চাতুরী ছলে।


যদি কখনো ডাক পাও, একটিবার তবে এসো,

নিকট হতে দেখব তোমায়, একটু পাশে বসো।


জানি ধরণীর নিকটে এলে, নিঃশেষ হয়ে যাবে,

ভাব তাহলে মানুষ জীবন, এখানে কেমন তবে!


একবার দেখে যেও, মেয়াদ যখন হবে শেষ,

বুঝবে এই বন্দি জীবন, কাটিয়ে গেলাম বেশ।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


হিসেব রাখিনি

পেয়েছি যা কিছু কোনো হিসেবেই তা রাখিনি,

হারিয়েছে সময়ে যত কোনোটাই আমি বাঁধিনি।

জানা নেই তবে হয়ত যোগের হিসেবে কম ছিল,

যা গিয়েছে বাদ সব, ওরা লম্বা সারিতে চলছিল।


ছড়িয়ে ছিল সুখের মেঘ জীবনে’র আকাশ জুড়ে,

তবু কেন তারা বর্ষালো ওই বেশ খানিকটা দূরে?

এমনি পাইনি উত্তর কত, গেছে হাত থেকে চলে,

মুঠোয় যখন ভরল সুখ, সেও তো আসেনি বলে।


সময় নাকি ভুলিয়ে দেয় সময়ের দেওয়া ব্যথা,

তাই হয়ত নেই মনে আর সুখের ভরা গাথা!

হারানোর যা গল্প ছিল, কষ্টের চাদর হয়ে ঢাকা,

চাপা পড়া সুখগুলো আজ দুঃখের রঙে আঁকা!



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


ঋণী

পেয়েছি কিছু খুচরো শব্দ তখন,

সেই তোমায় প্রথম দেখেছি যখন।

যদিও কলমে ছিল নীল কালি,

মনের বাগানে শুধুই চম্পা বেলি।


এলোমেলো শব্দ সব নিয়েছি গুছিয়ে,

স্তবক লিখে জানবে গিয়েছি পিছিয়ে।

হল কি ভুল বলো, তোমার রূপ বর্ণনে?

বিচলিত আমি তোমার আঁখির তর্জনে।


প্রশংসা করে পাঠকরা কবিতা পড়ে,

শব্দ পাই না যে রূপের বর্ণনা’র তরে। 

রয়ে যায় অধরা, এই সত্য আমি জানি,

পংক্তিগুলো রবে তোমার কাছে ঋণী।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


দেখেছি

দেখেছি তোমাকে গয়না গায়ে,

খোলা চুলেও দেখেছি তোমায়।

দেখেছি তোমাকে নুপুর পায়ে,

খোপার সাজে দেখেছি তোমায়।


উত্তর মেরুর তুমি সেই চঞ্চলা রঙ,

সাদা মাটাও আমি দেখেছি তোমায়।

দেখছি তুমি আজকের আধুনিকা বঙ,

মাতৃত্বের ভার নিতে দেখেছি তোমায়।


দেখেছি তোমাকে আলতা পায়ে,

টি-শার্ট জিন্সে দেখেছি তোমায়।

তোমার বক্ষে আগুন জ্বালিয়ে,

কেমনে শান্ত তবুও দূর্গা’র ন্যায়?


দেখেছি, তুমি গাঢ় কঠিন মেঘ,

নীল আকাশের মতো প্রশস্ত তুমি।

তুমি রেখেছ গভীরে সহস্র আবেগ,

আগলে রেখেছ ভালোবাসার ভূমি।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


মনের বাগান

বিগত কিছু বর্ষায় বাগান আগাছায় গেছে ভরে।

সবুজ রঙের আগাছা। ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে

মাঝে মধ্যে। একরকম অলঙ্কৃত হত সবুজ গালিচা।


মনের মাঝে ঘর করা আগাছা’র রঙ, আমার জানা

নেই। কখনও দেখিনি সেখানে সাদা ফুল ফুটতে বা

অন্য কোনো ফুলের পাইনি অস্তিত্বের প্রমাণ। এক

ধূসরসম মলিন চাদর ছেয়ে থাকে সারা মন জুড়ে।


বর্ষার ঐন্দ্রজালিক রচনা বাগানের সৌন্দর্য বর্ধিত

করে প্রাকৃতিক নিয়মে। হৃদয়ে অশ্রু বর্ষিত হয়েও 

কখনও তাকে কোনো প্রকার সৌন্দর্যায়নে পাইনি।

যদিও নোনা জল জন্ম দেয় কাঁটা গাছের ন্যায় 

তিক্ত ও পুরোনো স্মৃতির বিষাক্ত গাছ।


আশার আলো পৌঁছয় না মনের বাগানে, তবুও

অতীতের অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে জন্ম নেয় 

কালো রঙের বিষফল। কখনও স্মৃতির আঙিনা

দিয়ে ওদের বিশ্রী গন্ধ এসে জাগিয়ে তোলে মন।

অনেকটা সময় অব্দি ওদের ছুঁচলো, বিষাক্ত গুণ

আগামীর পথ চলাতে বাধা সৃষ্টি করে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


লাইব্রেরি

লাইব্রেরির ধুলো পড়া এক বেঞ্চে, সেখানে কম

আলোর দরুন কেউ বসত না। একটা বড় কাঁচের

জানালা আমাকে দিত মৃদু আলোয় রোমন্থন করার

সুবর্ণ সুযোগ! কেউ না বসার স্থানে পেতাম অতি

লোভনীয় ও আকাঙ্ক্ষিত একাকিত্ব। ছাদ থেকে 

একটা অকেজো হলদে বাল্ব ঝুলত, অনেকটা সেই

সময়ের সামাজিক ব্যবস্থার মতন!


মন্দ পরিস্থিতির এটাই ভালো দিক যে, জীবনে স্বল্প 

উপাদানের মধ্যে দিয়ে মানুষকে চলতে শেখায়। 

ক্লাসের ফাঁকে বিরতিতে, কিছু ক্লাসমেটের সান্নিধ্য

থেকে নিজেকে দূরে সরে থাকতে, আমি নিজেকে

লাইব্রেরিতে চালান করতাম। অভ্যেস ছিল, নিজ

গণ্ডিতে পেপার পেতে বসার। মাঝে মধ্যে ভাঙ্গা

কাঁচের খিড়কি দিয়ে সূর্য কে পার হতে দেখতাম।

মেঘলা দিনে এই মনের খোরাক অধরা রয়ে যেত।


বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও কবিতার প্রতি ছিল দুর্বলতা।

লাইব্রেরিতে উপস্থিতির ওটা ছিল মূল কারণ।

একদিন হঠাৎ, ইতিহাস বিভাগের এক পরিচিত

চেহারা এসে হাজির। টেবিলের উল্টো দিকে বসে

সুজাতা মৃদু হাসলো। মনে হল, লর্ড বাইরণ-এর

কবিতা, ‘শি ওয়াক্স ইন বিউটি’ বই ত্যাগ করে উঠে

আমায় দর্শন দিল। বুঝলাম মনের ভাঙ্গা জানালার

কাঁচের ওপারে, মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঠেছে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


লিপিবদ্ধ

অনেক কিছুই হবে না লেখা যা চিন্তায় আসে না।

যতটুকু চোখ খুলে থাকা হয়, তারও অনেক ক্ষুদ্র

ভাগ হয়তো লিপিবদ্ধ হবে। যেই নিঃশ্বাস নিয়ে রাত

পার হয় অচেতনতায়, সেই দীর্ঘ সময়ের মেয়াদ 

জীবনে স্মৃতি’র কলমের দ্বারা সম্মানিত হয় না। 

কোথাও তার কথা লেখা হয় না।


চোখ যা দেখে, মন তার বেশিরভাগই, এক সাধারণ

দৃষ্টি দিয়ে দেখার বিলাশিতায় অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য

কলমে জন্ম নেওয়ার পূর্বে হারিয়ে ফেলতে হয়।

যেই অভ্যন্তরীণ দেহযন্ত্র চোখ বন্ধ করার পর প্রথম

সূর্যের আলো দেখায় তার কথা তো লেখা হয় না।


শুধু চোখের আছে গুরুত্ব দেখার, মস্তিষ্কের সেই

সৌন্দর্যকে বর্ধিত করে কবিতায় স্থান দেওয়ার।

বাকিদের কৃতিত্ব সেই হারানো শ্রমিকদের মত যারা 

পিরামিড বানিয়েছিল। সবাই জানে তারা ছিলেন

কিন্তু উল্লেখ কোথাও নেই। অনেক সময়ে জীবনে,

ভালোবাসার উড়ো চিঠি অগ্রাধিকার পেলেও, সেই

চিঠি বহন করে আসা বায়ু স্রোতের গল্প কোথাও 

পাওয়া যায় না। অনেক হারানো অস্তিত্বের মধ্যে

রয়ে যায় লিপিবদ্ধ না হওয়া কাহিনী।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


তরতাজা অতীত

ছিল একঝুড়ি আকাঙ্ক্ষা পঁচিশ বসন্ত আগে, তুমি

ছিলে দুই দশকের আঙিনায়। আকাঙ্ক্ষার ঝাঁপিতে

ছিল রংবেরঙের ফুল, কিছু সুদগন্ধে লিপ্ত আর

কিছু সুবাসে কাতর না করতে পারলেও, ওরা ছিল

মনমোহক রঙের।


ছিল মৌমাছির ন্যায় ভিড়ের মাঝে তোমাকে

প্রথমবার দেখা। সেই প্রথমবার অপেক্ষারত বাস

স্টপে তুমি। জ্যৈষ্ঠ মাসের উত্তাপ উপেক্ষা করা এক

রূপালী চন্দ্রিমার মাধুরী! কি করে ভুলব বলো?

এ তো ভোলার নয়। আজও ভুলিনি তাকে।


ছিলাম আধা ঘণ্টা বাসে, তোমার থেকে দুটো সিট

পেছনে। ভালোলাগার সেদিন ঝরেছিল বারিধারা।

জানি, সে ছিল একতরফা। ভিড়ের মাঝে তোমার

বাম দিকটুকুই দেখা যাচ্ছিল। কিছু মানুষ আমার

ভালোলাগার মুহূর্তগুলোর শত্রু হয়ে আমার দৃষ্টি

রোধ করে দাঁড়িয়েছিল। তোমার পায়ের দিকে

তাকাতেই দেখি রুপোর পায়েল। আলিঙ্গনে আবদ্ধ

হয়ে থাকা পায়েল, আমার মনের মাঝে ঝংকার

তোলে। কিভাবে মনকে নাড়িয়ে দিল তা আমার

অজানা থেকে গেছে। তুমিও তাকিয়েছিল একবার

পেছন দিকে। আমায় মনে না থাকা স্বাভাবিক,

কিন্তু তাকে কেন ভুলতে পারিনি, তার কারণ 

আমার আজও অজানা রয়ে গেছে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

Sunday, July 5, 2026

সুযোগ

জীবনে অনেক সুযোগ আসে, সমুদ্রের ঢেউয়ের

মত। তোলপাড় করা, অতিকায় দৈত্যাকার দেহ

নিয়ে এগিয়ে আসে গর্জন করে। আশাতীত মানুষ

তারই অপেক্ষায় থাকে। 


সময়ের সাথে এসে এই সুযোগ হয়ে যায় শান্ত, 

লুটিয়ে পড়ে পায়ের কাছে যেমন লুটোয় 

পরিশ্রান্ত ঢেউ বালুকালয়ে।


প্রতিবার সুযোগ জীবনে আসে কিছু দিতে, তার 

পরিবর্তে কি মূল্য দিয়ে তা ক্রয় হবে সেটা ভাববার

বিষয়। উষ্ণ ঢেউয়ের ফেনা বালুকালয়ে মিলিয়ে হয়

অদৃশ্য চিরকালের জন্যে। 


যে হাত পেতে রাখে ওই ফেনাগুলোকে নিজের 

করে নিতে তারাই জীবনের ছোট ছোট 

মুহূর্তগুলো পূর্ণরূপে বাঁচতে জানে।


জীবনের তীরে দাঁড়িয়ে, মানুষের খেয়াল থাকে না

যে জোয়ার ভাটা অল্প অল্প করে পায়ের নিচের

বালি সড়িয়ে নিয়ে যায়। ক্ষয় হয়ে চলে জীবনের 

সীমিত সময়। 


কোনো কোনো মুহূর্তে উচিত, বালি অপসারণের

আগেই সমুদ্রের দিকে এগিয়ে তাকে আমন্ত্রণ করা,

তাকে উপভোগ করা। সব সুযোগ জীবনে কড়া

নেড়ে আসে না।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


আশ্চর্য সমাজ

ভাবি নিজের জীবন কাটাব নিজের মতো,

তবুও সমাজের যে আছে নিষেধ শত শত।

নিয়ন্ত্রণ নেই দেখি যাদের নিজ জীবনে,

তবে দেয় কেন উঁকি তারা অন্যের গগণে?


জানি স্বচ্ছ জল বয় না আর কোনো নদীতে,

কেমন এই জীবন অজস্র ‘কিন্তু’ বা ‘যদি’ তে?

নিদারুণ শূন্যতায় মস্তিষ্ক বিচরণ করে যার,

প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে শুনি তাদেরই হাহাকার।


নিজ জীবনে যত কষ্ট, বাকি সবাই রয় সুখে,

এই ভাবনায় কিছু জনের, জীবন কাটে দুঃখে।

কুয়ো’র ব্যাঙের, কুয়ো থেকে, বেরোনো হয় না

সৃষ্টির আলো বাতাস, কোনোটাই সে পায় না।


‘ভেবো না, আমি আছি’, এমনই মানুষ বলে

আসে বিপদ যখন, এরা পালায় সদলবলে।

আমি পর্দা বিহীন, দেখেছি কিছু নাট্যকার,

মুখে যাদের যুদ্ধ জয়, খোঁজে পথ পালাবার।


আশ্চর্য সমাজ! জেনো আমি ভালো আছি

তাড়ানোর কৌশল জানি, উদ্ভট মশা মাছি।

আশ্চর্য সমাজ! আমি রাখি নিজেকে ভুলিয়ে

আছে বহু গাধা জানি, নাকে গাজরটি ঝুলিয়ে। 



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


১০৮/বি ফিডার্স লেন (প্রথম স্পর্শ)

দুটি মনের ঠিকানা এক হলেও, তফাৎ ছিল শুধু

দুটো তলার। তিন মাসের পরিচিতি, দুজনের মধ্যে

এনেছিল এক অনন্য স্ফূর্তি। সারাদিনের অফিসের 

ঝঞ্ঝাটের পরেও, নিজেকে ভোরের আলোর মতন

তরতাজা লাগত। ভালোবাসার প্রভাবের যে অসীম

বিস্তার সেটা মন আগেই জেনে গিয়েছিল।


সকালে বেরোনোর সময় কখনোই আমরা পরিচিত

ব্যক্তির ন্যায় আলাপচারিতায় রত হতাম না। ও

দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতো। আমি লিফট থাকা

সত্বেও চারতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতাম। যেই

রেলিংয়ে ভর দিয়ে ও নামতো সেটা ছুঁয়ে নামা ছিল

ভোরের শিউলির ঘ্রাণে নিজেকে বিভোর করা। ওর

বাড়ির লোক বা প্রতিবেশী কেউ কিছুই জানত না।


আমার বেরোনোর আগে ও বেরোত। গলির বাঁক

থেকে ট্যাক্সিতে উঠতাম। বুঝতাম যে, এই অপেক্ষা

এক চাপা উত্তেজনা যা ভালোবাসার উষ্ণতাকে

শিখরের দিকে নিয়ে যায়। আঁখির মাধুরী জানে 

অপ্রকাশিতব্য বার্তা সঞ্চালন করে মনের মানুষের

কাছে পৌঁছে দেওয়া। স্ট্যান্ডে পৌঁছে একসাথে

ট্যাক্সিতে উঠতাম। সকালের প্রথম হাসির আদান

প্রদান তখনই হতো। একদিন ট্যাক্সিতে বসার পর

নিজের হাত আমার হাতে রাখলো। তাকাতেই, মৃদু

হেসে, আমার আঙুলের মাঝে নিজের আঙুল চেপে

ধরে। আবদ্ধ মুঠো টেনে ওর কোলের ওপর রাখে।

সেদিনও সুজাতা মুখে কিছুই বলেনি। 



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


১০৮/বি ফিডার্স লেন (প্রথম দেখা)

মফঃস্বলে বড় হয়ে মহানগরী দেখেছি প্রথম যখন

আমি সরকারি চাকরি পাই। সুজাতাকে তখন প্রথম

দেখি একই অফিসের অন্য দপ্তরে। অজস্র মানুষের

ভিড়ে এক জোড়া চোখ যেন তারা করে বেড়াত।


অফিসে খাওয়ার বিরতিতেই দেখা হতো ক্যান্টিনে।

শুরুর দিকে ছিল ভালোলাগার তাকানো, বলা চলে

একতরফা আমারই মনের চাহিদা। সীমিত হাসির

আদান প্রদান হয়েছে কয়েকবার। বুঝি যৌবনের

হৃদস্পন্দন হয় একটু ভিন্ন। বুকে ধিকধিক করা

চঞ্চলতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে মন চায় না, ভালোই

তো লাগে, হোক না!


বাড়ি ফেরার সময়ে একদিন বাস না পেয়ে বাধ্য 

হয়ে ট্যাক্সিতে উঠব ভাবছি, তখনই পাশ থেকে

সুজাতা বলল, ‘চলুন একসাথে যাওয়া যাক’।

স্বভাবতই এক মুহূর্ত নষ্ট না করে উঠলাম ট্যাক্সিতে।

এমনি কিছুদিন, দুজনে ট্যাক্সিতে ফিরতাম, সুজাতা

অফিসে তেমন কোনো কথা না বললেও দেখতাম

স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকত আমার অপেক্ষায়। সুজাতা

প্রস্তাব দেয় ওর বিল্ডিংয়ের চার তলায় ঘর আছে।

আমাকে ভাড়া নিতে বলে। বললাম, ‘কেন?’। কিছু

না বলে, মুখে আলতো হাসি ফুটিয়ে ট্যাক্সির বাইরে

তাকিয়ে থাকলো। সপ্তাহখানেক পর আমি পেলাম

স্থায়ী আবাসন, হৃদয় পেল তার নিজ ঠিকানা।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


ক্লাব ঘর

বিস্তৃত ঘেরাও করা মাঠের পশ্চিমে আছে একটি

পুরোনো ক্লাব ঘর। টিনের চাল, ভাজ করা পাল্লা

যেমন পুরোনো দোকানপাটে আগে দেখা যেত।

চালে অনেক অংশে মর্চের দাগ যদিও কিছু বছর

অন্তর তার দেয়ালগুলো রঙ করা হতো।


অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সন্ধ্যায় আসেন তাস খেলতে।

অনেকেই ছিল আমার পরিচিত, তবে অমল জেঠু

আমার কাছে মাঝে মধ্যে আসতেন আড্ডা দিতে।

উনি বাজারে যাওয়ার পথে আমার সাথে দেখা

করে যেতেন; একসাথে বসে কফি খেতাম, চলত

আলোচনা প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের বিপ্লবী

চিন্তাধারার এক অনবদ্য যুগলবন্দি।


তিন দশকের তফাৎ রেখেও এক টেবিলে বসে ভিন্ন

প্রকার বিষয়ের ওপর হতো আলোচনা। উভয়ই 

নিতাম এক অপরের থেকে শিক্ষণীয় মূল বস্তু। উনি

আমার জন্যে বাড়ির গাছের নিমপাতা আনতেন।

ওটা আমার খুবই প্রিয় খাদ্যবস্তু। ইতিমধ্যে, কিছুটা

সময় ব্যতীত হয়েছিল, আমিও কাজে ছিলাম লিপ্ত।

অনেকদিন হয়েছিল ওনার খোঁজ নেওয়া হয়নি।


অকস্মাৎ একদিন সকালে উনি হাজির। সেদিন

আমি আপ্লুত হতে পারিনি। ওনার দেহের কাঠামো

ভঙ্গুর দশার চরমে। বুঝলাম, মন ভেঙেছে দেহের

চেয়ে অধিক মাত্রায়। নিম পাতা এনেছিলেন, তবে 

কফি খেলেন না, আড্ডা হলো না। বললেন, ‘আর

হয়তো আসা হবে না’। দু’মাস পর উনি বিদায়

নিলেন। ক্লাব ঘরে তাসের আসরে অন্য এক ব্যক্তি

খেলেন। জগৎ চলছে নিজ ধারায়, শুধু কফি’র

আড্ডাটা আর কখনো হবে না।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


Wednesday, July 1, 2026

মায়া

ছায়া যে থাকে পাশে, মায়া পাওয়া যায় না দেখতে

অনেক চেষ্টা করেও তাকে, পারিনি আমি আঁকতে।

মায়া’র আছে ভিন্ন দিক, নাড়ীর আছে অসীম রূপ

ঋতুর মতন চঞ্চলতায়, কখনও বা সে একদম চুপ।


ছায়া ছাড়ে সঙ্গ রাত প্রহরে, মায়া রয়ে যায় স্থির

হই একাকী ছায়া ছাড়া, মায়া তবু ধৈর্য ধরে ধীর।

চলছে দেহ শ্বাসে, তারেও যায় না কখনো দেখা

বক্ষে বাঁধা স্পন্দন কত, এদের নিয়ে হয়নি লেখা।


মেঘ উজাড় করে বর্ষালো, সুন্দর শ্যামল গালিচায়

মৃত্তিকা নিল শুষে, কোমল বিন্দু মনের আঙিনায়।

দুর আসমানি বারিদ, নিজেকে শুধুই দেয় বিলিয়ে

রবির মায়া ত্যাগে, কালো অন্তরালে যায় মিলিয়ে


মায়া’র ছায়া দেখি, নিজের কলম, কবিতাগুচ্ছতে

চিন্তায় জন্মানো অক্ষর চায় নিজের রূপে সাজতে।

পৃষ্ঠাবন্দি মনের কথাগুলো, সময়ে অতীতে মেলাবে

নব ভাবনা কলম দ্বারা, বিদ্রোহের মশাল জ্বালাবে।


কিছু বছর হবে হয়তো, আমি রয়ে যাব ছায়া হয়ে,

লেখকের পরেও তার লেখনীর, মায়া যাবে রয়ে।

চাইনা আমায় কেউ রাখুক মনে, ধরণী ছাড়ার পরে

আমার জীবনের গল্প বাঁচুক শ্রোতাদের বক্ষ জুড়ে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


ছায়ামূর্তি

মাঝে মধ্যে কিছু ছায়ামূর্তি চোখে পড়ে। যেন মনে

হয় ওরা শুধু দৃশ্যমান আমারই নজরে। আছে ওরা

আমার আসেপাশে, একই উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে।

ওরাও কথা বলে নিজেদের মধ্যে, আমায় সরাসরি

কিছু জানায় না। খুবই অসস্তিকর, কারণ ওদের

কথোপকথনে আমি নিশ্চিত যে, কেন্দ্রস্থল ওই 

আলোচনার আমি নিজেই।


দিন, দুপুর হোক কি সন্ধ্যা, রাত এদের মাঝে মধ্যে

আমার নিকটে পাই, অনেকটা কাছে। তবুও জানি

না কেন, ওদের পুরো আলোচনা একত্রে পুরোটা

শুনতে পাই না, যেমন শুকনো বালু নিজ মুঠোয়

বন্দি করতে চাইলে কিছুটা ঝরেই পরে, থাকে না

নিজ নিয়ন্ত্রণে।


কখনও কোনো এক ধাবমান চিন্তাধারায় স্খলন

সৃষ্টি করার জন্যে দায়ী সেই ছায়ামূর্তি। চিন্তার পথে

নিয়ে আসে মানসিক বিভাজন। ভাবতে বাধ্য করে

একই চিন্তা একটু ভিন্নভাবে, একটু আলাদা করে।

এনে দেয়, এক নতুন স্বচ্ছ মাত্রা চলমান চিন্তায়।

সংকল্পে আনে বিশ্বাস, কর্ম রূপায়ণে আনে দৃঢ়তা।

এই ছায়ামূর্তি কখনও আমার সঙ্গ ছাড়েনি।

এই বন্ধু হলো বিবেক - ছিল, আছে ও থাকবে। 


  

প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬

প্রশিক্ষণ

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, শেখায় জীবনে সোজা

চলতে পারার মাহাত্ম্য। রাস্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে

বাঁকগুলোকে পার করা, যেন লোভ সম্বরণ করা।

ওরা হল সংযমের প্রশিক্ষণ জীবনে চলার পথে।

এখানে ভুলত্রুটির কোন অবকাশ নেই।


উড়ো মেঘেরও পথে ঘটে বিচ্যুতি, এই গোলকের

শ্যামল আস্তরণের ওপর আত্মসমর্পণ করার পূর্বে।

মেঘ শিখে নেয় তার স্বল্পমেয়াদী জীবনে বাতাসের

মৃদু ইশারায় না মেতে উঠতে, যদিও যৌবনের ইচ্ছে

ও উচ্ছাস স্বাভাবিক ভাবেই নিজ নিয়ন্ত্রণে বাঁধা

মোটেও সহজ নয়। এই নিজের মন কে বোঝায় -

তার উদ্দেশ্য দিকভ্রষ্ট না হয়ে পাহাড়ের চূড়া কে

আলিঙ্গনেই তার জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।


পাহাড়ি নদীর উচ্ছল জলধারা, নিজেকে ঝর্ণা রূপে

প্রতিষ্ঠিত করার পূর্বে, প্রতিটি বিন্দু তার ছিল এক

অপেক্ষায় - অপেক্ষা কৈশরীয় স্বাধীনতার প্রথম 

মনের পাখনা মেলে উড়ে চলার। তবুও, সেও রাখে

নিজেকে সংযত, বিন্দু বিন্দু করে নিজেকে ভরিয়ে

তোলে ঝর্ণার প্রথম ধারায় রূপান্তর করতে। সে এই

সীমাবদ্ধতা মেনেই পরবর্তীতে নিজেকে নদীরূপে

বহমান হয়ে সাগরের কাছে নিজেকে হারায়।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬


শূন্য থেকে শুরু

শূন্য থেকে জন্ম সবার, শূন্যে যাবে সব মিশে

ছিল শুরু ‘কিছু নেই’ থেকে, হবে শূন্য অবশেষে।

আকাশ, মাটি, জল ছিল পূর্বে, এরা রয়ে যাবে,

মাটির থেকে সৃষ্টি, আমায় ধুলোর মাঝেই পাবে।


বীজ থেকে যাত্রা শুরু, ফলের বৃক্ষ অতিকায়

নেই গর্ব, নেই অহং, এমনি তার জীবন যায়।

ফুল বিলিয়ে সুবাস তার, এক স্বল্প আয়ু পায়

নিঃশেষ করে তার সবটুকু নতমস্তক রয় তায়।


অট্টালিকাতে নেই শান্তি, কেউ বা সুখী কুঁড়েঘরে

চাহিদার নেই শেষ, সেটাই তাড়া করে জীবনভরে।

থামবে কখন জানে না মানুষ, শুরু তাঁর খালি হাতে

কুড়িয়ে, ভরিয়ে ছুটছে সে, দৌড় অন্ত সন্ধ্যা রাতে।



প্রসেনজিৎ দাস © ১৯৯৭-২০২৬